খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ভদ্রা খালে মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও অবৈধ মৎস্য আহরণ প্রতিরোধে এক বিশাল যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়েছে। অভিযানের মাধ্যমে খাল থেকে বিপুল পরিমাণ ক্ষতিকারক নেট-পাটা ও রিং জাল (চায়না দুয়ারী) অপসারণ করে তাৎক্ষণিকভাবে তা জনসম্মুখে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়।

​বুধবার দুপুর আড়াইটার দিকে উপজেলা প্রশাসনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এ উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। ডুমুরিয়া উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা মৎস্য দপ্তর এবং ডুমুরিয়া থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল এতে যৌথভাবে অংশ নেয়।

​দীর্ঘদিন ধরে একশ্রেণীর অসাধু জেলে ও দখলদার ভদ্রা খালের বিভিন্ন পয়েন্টে বাঁশের বেড়া বা নেট-পাটা দিয়ে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ আটকে রেখেছিল। এছাড়া ক্ষতিকারক ‘চায়না দুয়ারী’ জালের অবাধ ব্যবহারে রুই, কাতলা, মৃগেল থেকে শুরু করে ছোট আকারের দেশীয় প্রজাতি যেমন—টেংরা, পুঁটি, খোলসে ও বাইম মাছের রেনু পোনাও ধ্বংস হচ্ছিল। এতে স্থানীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে। খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগ যৌথভাবে পুরো ভদ্রা খালজুড়ে এই বিশেষ অভিযান চালায়।

​অভিযান পরিচালনাকালে খুলনা ডুমুরিয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) অমিত কুমার বিশ্বাস এই প্রতিনিধিকে বলেন:

​”ভদ্রা খাল আমাদের খুলনার পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় কিছু অসাধু লোক খালের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি ও পানি প্রবাহ আটকে অবৈধ নেট-পাটা ও চায়না দুয়ারী জাল বসিয়েছিল। এটি সম্পূর্ণ বেআইনি এবং দণ্ডনীয় অপরাধ। সরকারি নির্দেশনানুযায়ী আমরা কোনো প্রকার বেআইনি কাজ সহ্য করব না। ডুমুরিয়ার কোনো খাল বা উন্মুক্ত জলাশয়ে কোনো অবৈধ জাল বা নেট-পাটা থাকবে না। জলাশয়গুলো জনসাধারণের, এখানে কৃত্রিম বাধা সৃষ্টি করে প্রকৃতিকে ধ্বংস করতে দেওয়া হবে না। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আগামীতে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে এবং প্রয়োজনে কঠোর আইনি শাস্তির আওতায় আনা হবে।”

​অভিযানের টেকনিক্যাল ও সামাজিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সোহেল মোঃ জিল্লুর রহমান রিগান বিশদ সাক্ষাৎকারে বলেন:

​”চায়না দুয়ারী এবং নেট-পাটা মাছের জন্য এক ধরনের ‘নীরব ঘাতক’। এর ফাঁদ এতই ছোট যে, পানির একদম তলদেশ দিয়ে চলাচলকারী মাছের ডিম ও রেনু পোনা পর্যন্ত এতে আটকে মারা যায়। ডুমুরিয়া উপজেলাকে মৎস্যসম্পদে সমৃদ্ধ রাখতে হলে এই ক্ষতিকর প্রবণতা বন্ধ করতেই হবে। তাই আমরা সরাসরি মাঠে নেমে এই সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছি। তবে শুধু আমরা উচ্ছেদ অভিযান চালালেই এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে। অনেক সময় অসচেতনতার কারণেও ক্ষতিকর জাল ব্যবহার করা হয়। বাজারে এসব জালের কেনাবেচা বন্ধের পাশাপাশি আমরা সচেতনতামূলক প্রচারণাও চালাব। উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগ এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর ও আন্তরিক। দেশীয় মাছের বংশবৃদ্ধি ও প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখতে আমাদের এই ধরনের সাঁড়াশি অভিযান ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত থাকবে।”

​অভিযান চলাকালে ভদ্রা খালের দুই পারের স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা দেখা যায়। মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনের এ ধরনের শক্ত পদক্ষেপে তাঁরা আনন্দ প্রকাশ করেছেন।

​স্থানীয় এক বয়োবৃদ্ধ বাসিন্দা বলেন, “আমাদের এলাকায় আগে কখনো এমন অভিযান দেখিনি। অফিসে বসে সেবা দেওয়ার পাশাপাশি কর্মকর্তারা এখন সরাসরি খালে-বিলে নেমে এই ক্ষতিকর জাল উচ্ছেদ করছেন, যা প্রশংসার দাবিদার। খালটি মুক্ত হলে দেশি মাছ যেমন বাঁচবে, তেমনি পানির প্রবাহও ঠিক থাকবে।”

​সংশ্লিষ্ট পরিবেশবিদ ও স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, ডুমুরিয়া উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য দপ্তরের এই যৌথ উদ্যোগ নিয়মিত বজায় থাকলে ভদ্রা খালসহ আশেপাশের জলাশয়ে অবৈধ মৎস্য আহরণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে, যা দেশীয় মাছের প্রাকৃতিক বংশবৃদ্ধি ও দক্ষিণাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
শেখ মাহতাব হোসেন। ডুমুরিয়া খুলনা।০১৭১১৩৬৪৪৩১

পোস্টটি শেয়ার করুনঃ